২০২৪ সালে বাংলাদেশী টাকা এশিয়ার অন্যতম দুর্বল মুদ্রা

বিনিময় হার নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থনীতির ভারসাম্যে চাপ তৈরি করছে

যেকোনো অর্থনীতিতেই বিনিময় প্রথার প্রধান মাধ্যম হলো মুদ্রা। মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থান অর্থনীতির দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, বাংলাদেশী টাকা এখন এশিয়ার অন্যতম দুর্বল মুদ্রা

যেকোনো অর্থনীতিতেই বিনিময় প্রথার প্রধান মাধ্যম হলো মুদ্রা। মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থান অর্থনীতির দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, বাংলাদেশী টাকা এখন এশিয়ার অন্যতম দুর্বল মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। টাকার মান দুর্বল হওয়ায় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচককেও প্রভাবিত করেছে। বিগত সরকার ডলারের সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন না ঘটিয়ে অতিমূল্যায়িত করে টাকাকে শক্তিশালী দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সাল-পরবর্তী সময়ে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো যায়নি। ডলারের চাপ তৈরি হওয়ার পরপরই যদি বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হতো, এতদিনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যেত। সরকারের ভুল নীতির কারণে আমদানি ব্যয়সহ আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়েছিল। ফলে টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের পাশাপাশি রিজার্ভও দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। বিনিময় হারকে বাজারের সঙ্গে ওঠানামা করতে না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছে। বিনিময় হার নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা অর্থনীতির ভারসাম্যে চাপ তৈরি করছে। শুরু থেকেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া গেলে অর্থনীতি এত সংকটময় অবস্থায় পড়ত না।

বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত দর অনুযায়ী, চলতি ২০২৪ সালের শুরুতে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় হার ছিল ১১০ টাকা। আর গত ১৭ ডিসেম্বর প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ দর ১২০ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত এ দর আমলে নিলে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে ব্যাংকগুলো এখন ১২৬ টাকায়ও রেমিট্যান্সের ডলার কিনছে। ডলারের অঘোষিত এ দর আমলে নিলে চলতি বছর টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছে ১৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। আর ২০২২ সালের জানুয়ারির সঙ্গে তুলনা করলে গত তিন বছরে টাকার ৪৭ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। যদিও অনেক বছর ধরে বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার তেমন কোনো আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠেনি। এর একটা বড় কারণ হলো ডলার ও টাকার দরে অনেক বছর ধরেই তেমন কোনো ওঠানামা ছিল না। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হতে থাকে। ওই সময় দরকার ছিল ডলারের দর বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে ধীরে ধীরে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটানো। সর্বশেষ আইএমএফের ক্রলিং পেগ নীতি অনুসরণ করে বিনিময় হার নির্ধারণ করে দেয়া হয়। তার পরও বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আসেনি।

ডলারের সরবরাহ মূলত বাংলাদেশে আসে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স থেকে। আর চাহিদা তৈরি হয় আমদানি এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই চাহিদা ও জোগান তথা বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার অনেক বছর ধরেই সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে সেটার সঙ্গে বাজার দ্বারা নির্ধারিত হারের যে অনেক পার্থক্য ছিল, তা নয়। বাজার নির্ধারিত মূল্য ও সরকার–নির্ধারিত মূল্যের এ পার্থক্য বোঝা যায় যখন ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ডলার ক্রয় করা হয়। বাংলাদেশে সাধারণত এ দামের পার্থক্য ২-৩ টাকার বেশি ছিল না। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর এ সমীকরণ অনেকটাই পাল্টে যায়। বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই বাজার নির্ধারিত হার অনেক বেশি হয় সরকারি রেটের চেয়ে। কিন্তু সরকার বাজার নির্ধারিত হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা থেকে বিরত থাকে। বিগত সরকারের অর্থনীতি পরিচালনার অনেক ভুল নীতির মধ্যে এটি ছিল অন্যতম।

বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের একটি বড় অংশ আমদানি থেকে আসে। তাই ডলারের বিনিময় হার বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। আর আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে সেই পণ্য স্বাভাবিকভাবেই বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি হয়। ফলে বিক্রি কম হবে। এতে ব্যবসায়ী, ভোক্তা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ ভাবনা আপাতদৃষ্টে বেশ যৌক্তিক মনে হলেও বিষয়টি এত সরল নয়। ডলারের দাম কম রাখতে গিয়ে সরকারকে রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার সরবরাহ করতে হয়েছিল। কিন্তু সরকারের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ ডলারের রিজার্ভ দ্রুত কমে আসছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে (২০২১ সালের আগস্টে) যেখানে রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল, দুই বছর পর সেটি প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি চলে আসে। এ কারণে সরকারি রেটে সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত ডলার সরকারের কাছে ছিল না। তাই ব্যাংকগুলোর কাছেও ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়। তাদের ডলার সংগ্রহ করতে হয় উঁচু রেটে বাজার থেকে, কিন্তু বিক্রি করতে হয় সরকারি রেটে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংকগুলো এ ক্ষতির শিকার হতে চায়নি। ফলে আমদানিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে। আমদানি কমে যাওয়ায় তৈরি হয় পণ্যের ঘাটতি। এতে নিত্যপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যায়।

অন্যদিকে আরো মারাত্মক যে ঝুঁকি তৈরি হয় সেটি হলো রফতানি নিয়ে। ডলারের বিপরীতে টাকার দাম পড়ে গেলে রফতানিকারকদের সুবিধা। কারণ তখন একই পরিমাণ ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা উপার্জিত হয়। কিন্তু সরকার যদি কৃত্রিমভাবে ডলারের দাম কমিয়ে রাখে, তখন রফতানিকারক সেই উপার্জন করতে পারেন না। তখন অনেক রফতানিকারক ডলার আর সরকারি চ্যানেল দিয়ে আনেন না। কেউ কেউ ডলার বিদেশের ব্যাংকে রেখে দেন। অথবা হুন্ডির মাধ্যমে আনেন। এর পুনরাবৃত্তি দেখা যায় প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও। সরকারি চ্যানেলে পাঠানো রেট কম থাকায় অনেক প্রবাসী তাদের আয় হুন্ডির মাধ্যমে পাঠান। রফতানি আয় আর প্রবাসী আয় দুটিই বৈদেশিক আয়ের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু সেগুলো আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে না এসে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আসে। ফলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ কম থাকে। তাই এত দিন ধরে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকিয়ে রেখে রফতানি আর বৈদেশিক আয় দুটিকেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে। এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে ফেলেছে।

বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান এ তিন দেশের অর্থনৈতিক সংকট প্রায় একই সময়ে শুরু হয়েছিল। এ সংকটের সূচনা হয়েছিল ২০২০ সালে নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট বৈশ্বিক দুর্যোগ থেকে। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া এ তিন দেশেই গত তিন বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের অর্থনীতি বেশ ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দুটি দেশেরই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে এবং রিজার্ভ বাড়ছে। ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশ। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে বিগত সরকারের পতন হলেও এখনো অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। কারণ গত দেড় দশকের অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতে আর্থিক দুর্নীতি ও নীতিনির্ধারকদের ভুল নীতির প্রভাবে দেশের অর্থনীতি এখন সংকটাপন্ন। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে দেশের সীমিত আয়ের মানুষ অসহনীয় ভোগান্তিতে আছে। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংককে অতীতের বকেয়া এলসি দায়সহ অন্যান্য দায়ও পরিশোধ করতে হচ্ছে। ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের এলসি খোলা বাড়ছে। এ কারণে ডলারের চাহিদাও বাড়ছে। তবে আমরা দেখছি, ডলারের জোগানও বেশ বেড়েছে। বিশেষ করে চলতি অর্থবছরে নভেম্বর পর্যন্ত রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ২৬ শতাংশেরও বেশি। আর রফতানি আয়ের প্রবৃ্দ্ধিও এখন ৮ শতাংশের ঘরে। এছাড়া বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফসহ দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যেসব ঋণসহায়তা পাওয়া যাবে তাতে ডলার সরবরাহ আরো বাড়বে। সব মিলিয়ে ডলারের বিনিময় হারকে এখন বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। এতে সাময়িকভাবে বাড়লেও পরবর্তী সময়ে ডলারের দর কমে আসতে পারে। যদি ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্থির করে রাখা হয় তাহলে বাজার নির্ধারিত হারের সঙ্গে আরো ব্যবধান বেড়ে যায়। তখন অবৈধ প্রক্রিয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনও বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ বাড়াতে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে বিনিময় হারের ওপর এ নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নেয়া জরুরি। পাশাপাশি দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

আরও